Wednesday, April 19, 2017

৭ কলেজের ২ লাখ শিক্ষার্থী বিপদে

৭ কলেজের ২ লাখ শিক্ষার্থী বিপদে



৭ কলেজের ২ লাখ শিক্ষার্থী বিপদে
দীর্ঘদিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা রাজধানীর বড় সাতটি সরকারি কলেজ সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়েছে। তবে এর পর থেকেই সংকটে পড়েছে এসব কলেজে অধ্যয়নরত প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী। অনেক শিক্ষার্থীরই রচনামূলক পরীক্ষা শেষ হয়েছে, কিন্তু কয়েক মাস ধরে আটকে আছে ব্যবহারিক পরীক্ষা। বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষারও নতুন করে কোনো তারিখ ঘোষণা করা হচ্ছে না। কলেজগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গেলেও এখনো সিলেবাস বা পাঠ্যক্রমে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। সিলেবাসবিহীন অবস্থায়ই পড়ালেখা করছে শিক্ষার্থীরা। ফলে তাদের সেশনজটে পড়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সাত সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এগুলো হচ্ছে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। অধিভুক্ত হওয়ার পর পরীক্ষা, ক্লাসসহ সার্বিক লেখাপড়া নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় শিক্ষার্থীরা উদ্বেগে রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি তাঁদের বিভিন্ন বক্তব্যেও দ্বন্দ্বের বিষয়টি ফুটে ওঠে। সরকার যখন সরকারি কলেজ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দিতে চায় তখন থেকেই রাজধানীর নামি কলেজগুলো নিজেদের আয়ত্তে নিতে উঠেপড়ে লাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা না করে কোনো কোর্স কারিকুলাম বা পরিকল্পনা না করেই সাতটি কলেজ নিয়ে নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এতে হঠাৎ সংকটে পড়ে শিক্ষার্থীরা।
গত মাসে সরকারি তিতুমীর কলেজের এক অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘খাতা না দেখেই চূড়ান্ত ফল দেয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে তাদের শিক্ষার মান কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের আত্মীয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক। তিনি একবার অনার্সের খাতা নিলেও অসুস্থতার কারণে দেখতে পারেননি। তাই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানান, দ্রুত যেন খাতা নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর পক্ষে খাতা দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু মাসখানেক পার হলেও কেউ খাতার ব্যাপারে খোঁজ নেয়নি। এর কিছুদিন পরেই ফলাফল দিয়ে দেওয়া হয়। অথচ তখন অদেখা অবস্থায় কয়েক শ খাতা ওই শিক্ষকের বাসায় পড়ে ছিল। এই হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার অবস্থা। ’
তবে ঢাবি উপাচার্যের এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ অসত্য, মনগড়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিদ্বেষপ্রসূত বলে উল্লেখ করে তা প্রমাণের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে ঢালাওভাবে মনগড়া এরূপ বক্তব্য প্রদান একজন উপাচার্যের দায়িত্বশীল পদে আসীন ব্যক্তির পক্ষে কতদূর সমীচীন, তা কারো পক্ষে না বোঝার কথা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যে একজন চরম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-বিদ্বেষী, তাঁর এ বক্তব্য থেকে সেটি স্পষ্ট। ড. আরেফিন সিদ্দিককে তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হলো। অন্যথায় তাঁর এ ধরনের অসত্য, মনগড়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের বিরুদ্ধে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। ’
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অধিভুক্ত সাত কলেজ নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারণের কাজ চলছে। তবে অধিভুক্ত কলেজ আমাদের জন্য নতুন নয়। আগেও এই কলেজগুলো আমাদের অধীনে ছিল। ফলে কোনো সমস্যা হবে না। আমরা সব কিছুই ডিজিটাল পদ্ধতিতে করার চেষ্টা করছি। যাদের ব্যবহারিক পরীক্ষা বাকি আছে শিগগির আমরা তা নেওয়ার চেষ্টা করব। আর নতুন পরীক্ষার তারিখও দ্রুত ঘোষণা করা হবে। ’
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা (সাত কলেজের অধিভুক্তি) সরকারি সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই ভালো জানে। তারা যেটা ভালো মনে করেছে সেটাই করেছে। আমরা অনার্স চতুর্থ বর্ষের লিখিত পরীক্ষা নিয়েছি, ব্যবহারিক নেওয়ারও সময় দেওয়া হলো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে আমাদের কাছে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের তথ্য চাওয়া হয়েছে। আমরা সেগুলো প্রস্তুত করছি। প্রথম দিকে তো কিছুটা সমস্যা হবেই। আশা করি, আস্তে আস্তে সেটা তারা উতরে যবে। ’
জানা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫ সালের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের লিখিত পরীক্ষা শুরু হয়েছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই, ৩ জানুয়ারি। শেষ হয় গত ১১ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ব্যবহারিক শুরুর আগেই কলেজগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যায়। যদিও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় থাকা অন্য কলেজগুলোর ব্যবহারিক পরীক্ষা ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের নিয়মিত ও প্রাইভেট (নতুন সিলেবাস) এমএ, এমএসএস, এমবিএ, এমএসসি ও এম মিউজ শেষ পর্ব পরীক্ষার রুটিনও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করেছে। ২০১৬ সালের ডিগ্রি পাস ও সার্টিফিকেট কোর্স পরীক্ষার সময়সূচিও ঘোষণা করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি অন্ধকারে রয়েছে। তারা এই পরীক্ষায় অংশও নিতে পারছে না।
এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্স শেষ পর্ব পরীক্ষার সময়সূচিতে রাখা হয়নি অধিভুক্ত সাত কলেজ। ইতিমধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই শিক্ষাবর্ষে মাস্টার্সের একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও এই সাত কলেজের শিক্ষার্থী এতে অংশ নিতে পারেনি। এমনকি এসব কলেজের শিক্ষার্থীর তথ্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকেও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইডেন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. শামসুন নাহার বলেন, ‘কিছুটা গ্যাপ হয়ে যাচ্ছে। আশা করছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তা পূরণ করে ফেলবে। ’ সরকারি তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবু হায়দার আহমেদ নাসের বলেন, ‘এটা সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আমাদের এখানে কিছুই বলার নেই। ’
সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় থাকাকালীন ওই সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের অনেকে এক বা একাধিক বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হয়ে পরের বর্ষে প্রমোশন পেয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষার আগে পূর্বের বর্ষের অনুত্তীর্ণ বিষয়গুলোতে উত্তীর্ণ না হলে ফল স্থগিত থাকে। এখন এ  ধরনের শিক্ষার্থী, যারা একাধিক বর্ষে বিভিন্ন বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হয়েছে, তারা কোন সিলেবাসে, কোথায় পরীক্ষা দেবে তা নিয়ে চরম বিভ্রান্তিতে আছে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে খুব শিগগির এসব শিক্ষার্থীর সমস্যা সমাধানও সম্ভব নয়।
ঢাকা কলেজের সমাজবিজ্ঞানের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন বলেন, ‘আমি দ্বিতীয় বর্ষের একটি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তৃতীয় বর্ষে প্রমোশন পেয়েছি। এখন আমার দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষাটা কে নেবে? আর যদি এই পরীক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নতুন কারিকুলামে নেয় তাহলে আমি কিভাবে পরীক্ষা দেব? আর এমনিতেই আমরা প্রায় এক বছরের সেশনজটে আছি। এখন যদি পরীক্ষা শুরু করতে আরো দেরি হয় তাহলে বড় সেশনজটে পড়ে যাব। ’
জানা যায়, চলতি মাসেই শেষ হবে এইচএসসি পরীক্ষা। জুলাই থেকে শুরু হবে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি প্রক্রিয়া। এত দিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এই সাত কলেজে মেধার ভিত্তিতে ভর্তি করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে ভর্তি করবে তা এখনো ঘোষণা করেনি। সাধারণত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে থাকে। তাই এই সাত কলেজেও যদি ভর্তি পরীক্ষা নিতে হয় তাহলে অনেক বড় আয়োজন করতে হবে। আর এখনই যদি ভর্তি পরীক্ষার ঘোষণা দেওয়া না হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রস্তুতিও নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা ভর্তি নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছে।
অধিভুক্ত কলেজগুলোর বিভিন্ন বর্ষের একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, তারা এখনো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস পড়ছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই সিলেবাস রাখবে, না নতুন করে দেবে তা এখনো বলেনি। আর একজন শিক্ষার্থীর অর্ধেক পড়ালেখা শেষে তাদের জন্য নতুন সিলেবাসে পড়ালেখা করাটা কঠিন।  
সরকারি তিতুমীর কলেজের অর্থনীতি অনার্স কোর্সের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আদনান হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসেই আমি দুটি বর্ষ শেষ করেছি। এখন যদি আমাকে নতুন করে সিলেবাস দেয় তাহলে তার সঙ্গে তাল মেলানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তির দুই মাস পার হয়ে গেলেও আমরা নতুন কোনো পাঠ্যক্রম বা নির্দেশনা পেলাম না। এতে খুবই চিন্তায় আছি। আর নতুন সিলেবাস এলে নির্ঘাত আমাদের রেজাল্ট খারাপ হবে। এর দায়দায়িত্ব কে নেবে? তাই আমরা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই থাকি না কেন আমাদের যেন পুরনো সিলেবাসেই লেখাপড়া শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয়। ’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ৪৫ হাজার শিক্ষার্থী নিয়েই হিমশিম খাচ্ছে। এর ওপর যোগ হয়েছে আরো সাত কলেজের দুই লাখ শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া, খাতা দেখা, ফল প্রকাশ, রেজিস্ট্রেশন, ভর্তি, ফরম পূরণ, একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাদের বড় ধরনের জনবল দরকার। কিন্তু এই আয়োজন এখনো শুরুই করতে পারেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
নাম প্রকাশ না করে রাজধানীর একটি সরকারি কলেজের একজন বিভাগীয় প্রধান বলেন, ‘সাধারণত কোনো কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণার দিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। এই সাত কলেজের ক্ষেত্রেও একই কাজ করা হয়েছে। কিন্তু মনে রাখা উচিত ছিল, এই সাত কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই লাখ। তাদের বিভিন্ন ধরনের কোর্স রয়েছে। ফলে এত শিক্ষার্থীকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে বেশ বেগ পেতে হবে। এ ক্ষেত্রে যদি ঘোষণার পরবর্তী বর্ষে যারা ভর্তি হবে তাদেরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হতো তাহলে আর কোনো সমস্যা হতো না। ’
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজধানীর সাত কলেজ অধিভুক্ত হয়েছে। তাই পুরো কাজটা তাদেরই, এখানে আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই। কলেজগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গেলে কী হবে আর না গেলে কী হবে—এ বিষয়ে আমরা আগেই মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।   দুই লাখ শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গেলে তাদের জনবল, টাকা-পয়সা কী লাগবে সেটাও প্রতিবেদনে আছে। এত শিক্ষার্থী সামাল দেওয়া, পরীক্ষা নেওয়া, খাতা দেখা তো চাট্টিখানি কথা নয়। ’
জানা যায়, ২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সরকারি কলেজগুলোকে সংশ্লিষ্ট এলাকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়ার নির্দেশ দেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রায় দুই হাজার ১৫০টি কলেজে ২১ লাখ শিক্ষার্থী থাকলেও সরকারি ১৮৪টি কলেজেই অধ্যয়ন করে ১৩ লাখ শিক্ষার্থী। সরকারি কলেজ পৃথক করার এই সিদ্ধান্তে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সে সময় আপত্তি জানিয়েছিল। তবে টেকেনি। গত বছরের ২৮ অক্টোবর এক সভায় অধিভুক্ত সরকারি কলেজগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৮৪টি কলেজকে ভাগ করে দিতেও সুপারিশ করে এ বিষয়ে গঠিত কমিটি। এর মধ্যে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজধানীর সাত কলেজ দেওয়া হয়। যদিও বাকি ১৭৭টি কলেজকে এখনো অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেওয়া হয়নি।  
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) আব্দুল্লাহ আল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাত কলেজের দায়িত্ব যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েছে তাই পুরো দায়দায়িত্বই তাদের। তাদেরই উচিত এ ব্যাপারে দ্রুত করণীয় ঠিক করা। ’

Saturday, April 1, 2017

ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজ: দুই একদিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত

অধিভুক্ত সাত কলেজ ইস্যুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর প্রতিনিধিদলের সাথে আজ বৈঠক হয়েছে। ঢাবির অধিভুক্ত হওয়ার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও কোন নীতিমালা হাতে না পাওয়ায় শঙ্কার মধ্যে ছিলেন সাত কলেজের প্রায় দুই লক্ষ শিক্ষার্থী। দ্রুত নীতিমালা প্রকাশের দাবিতে মানবন্ধনও করেছিলো শিক্ষার্থীরা। আজ এই বৈঠকের ফলে শিক্ষার্থীদের সব অপেক্ষার অবসান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শনিবার বিকাল তিনটার দিকে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে পূর্বপশ্চিমকে নিশ্চিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। ঢাবি উপাচার্য জানিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা করা হয়েছে। দুই-তিন দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে নোটিশ আকারে জানানো হবে। তবে বৈঠকে কি কি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে তা তিনি এই মুহূর্তে জানাতে রাজি হননি।
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোয়াজ্জম হোসেন মোল্লা পূর্বপশ্চিমকে বলেন, অধিভুক্ত কলেজগুলোর সিলেবাস, পরীক্ষা ও কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সম্পর্কে শিগগিরই শিক্ষার্থীরা জানতে পারবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে উপস্থিত এক প্রতিনিধি জানান, এই সপ্তাহে সাত কলেজের প্রতিনিধিদেরকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি শিক্ষার্থীদের দ্রুত পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে কাজ করবে। কলেজের অধ্যক্ষরা তার প্রতিষ্ঠান থেকে নাম প্রস্তাব করবেন এবং তারাই পরীক্ষা কর্যক্রম সম্পন্ন করবেন।
অধিভুক্ত কলেজগুলোর যেসব শিক্ষার্থীরা শিক্ষাবর্ষের শেষ দিকে রয়েছেন এবং যারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফরম পূরণ করেছেন তাদের পরীক্ষা এবং ডিগ্রি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত হয়েছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন অধ্যক্ষ পূর্বপশ্চিমকে বলেন, তাদের সবার পরীক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হবে। এ বিষয়ে আগামী সোমবারের মধ্যে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি কলেজ, মিরপুর সরকারি বাংলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করে সরকারি আদেশ জারি করা হয়। ওই দিনই কলেজ অধ্যক্ষদের সঙ্গে ঢাবি উপাচার্যের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে উপাচার্য জানিয়েছিলেন, এই অধিভুক্ত কলেজগুলোর ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি প্রক্রিয়া, পরীক্ষাসহ অন্য কার্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিচালিত হবে।

Tuesday, March 21, 2017

উচ্চশিক্ষায় ইংরেজির ভয়!

উচ্চশিক্ষায় ইংরেজির ভয়!

স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বেশির ভাগ বই ইংরেজিতে লেখা। স্কুল-কলেজে যাঁদের ইংরেজির ভিতটা ভালোভাবে গড়ে ওঠে না, হঠাৎ করেই ইংরেজি মাধ্যমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খান তাঁরা
স্কুল–কলেজে বাংলা মাধ্যমে পড়ে আসা অনেক শিক্ষার্থীরই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ‘লেকচার’ বুঝতে সমস্যা হয়। কৃতজ্ঞতা: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। ছবি: খালেদ সরকারস্কুল–কলেজে বাংলা মাধ্যমে পড়ে আসা অনেক শিক্ষার্থীরই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ‘লেকচার’ বুঝতে সমস্যা হয়। কৃতজ্ঞতা: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। ছবি: খালেদ সরকারআদৃতা (ছদ্মনাম) স্কুল-কলেজে বাংলা মাধ্যমে পড়েছেন। এরপর ভর্তি হয়েছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে। নতুন ক্যাম্পাস, নতুন বন্ধু...ভালোই লাগছিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর মধ্যে ক্লাসভীতি জন্মে গেল। কেন? কারণ স্নাতক পর্যায়ের মোটা মোটা বইগুলোর সবই ইংরেজিতে লেখা। শিক্ষকেরা ক্লাসে পড়ান ইংরেজি ভাষায়। আদৃতা হয়তো একটা কিছু বুঝতে পারছেন না, প্রশ্ন করবেন ভাবছেন। কিন্তু ইংরেজিতে প্রশ্নটা বলতে গিয়ে ব্যাকরণে ভুল হয়ে যাবে না তো! এই শঙ্কায় আর মুখ খোলা হয় না। বাংলা বা ইংরেজি যে ভাষায়ই হোক, শিক্ষকেরা সব সময় প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেন। কিন্তু আদৃতা যে ভালো ইংরেজি জানেন না, সহপাঠীদের সামনে এই ব্যাপারটা তিনি ‘ফাঁস’ করতে চান না। পাছে যদি ক্লাসের বন্ধুরা তাঁকে ‘খ্যাত’ ভেবে বসেন! তাঁর আপত্তির কারণেই এই প্রতিবেদনে মন্তব্যটা ছদ্মনামে লিখতে হলো।
আদৃতার মতো প্রায় একই সমস্যায় ভুগছেন দেশের বহু শিক্ষার্থী। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বেশির ভাগ বই ইংরেজিতে লেখা। স্কুল-কলেজে যাঁদের ইংরেজির ভিতটা ভালোভাবে গড়ে ওঠে না, হঠাৎ করেই ইংরেজি মাধ্যমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খান তাঁরা।
‘উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষা ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল বেশ আগে। কিন্তু বাজারের চাহিদার কারণে ইংরেজি পড়াতে হচ্ছে’, বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শাদমান সাকিব অবশ্য জানালেন, বইগুলো ইংরেজিতে লেখা হলেও তাঁদের শিক্ষকেরা ক্লাসে বাংলায় পড়ান। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র তিনি। বইয়ের পড়া বুঝতে একটু বেগ পেতে হচ্ছে ঠিক। কিন্তু শাদমান আশা করছেন, দ্রুতই এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
কিন্তু যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বাংলায় হয় না, তাঁদের অবস্থা কেমন? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাফিউজ্জামান চঞ্চল বলছিলেন, ‘প্রথম দিন ক্লাসে গেছি। স্যার ক্লাসে এসে ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করলেন। আমার অবস্থা বেগতিক। একে তো মাইক্রো বায়োলোজির টার্ম বুঝি না, তার ওপর স্যারের উচ্চারণ ধরতে পারছিলাম না।’ সমস্যাটা অবশ্য দ্রুতই কাটিয়ে উঠেছেন তিনি। কীভাবে? সেটা শুনব। আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুমু বড়ুয়ার সংকটটা শোনা যাক। তাঁর সমস্যা শুধু ইংরেজিই নয়, ‘লিগ্যাল ইংলিশ’। সেটা কী? মুমু বলেন, ‘লিগ্যাল রিসার্চ ম্যাথলজিতে আমাদের ল্যাটিন শব্দে ইংরেজি পড়তে হয়।’ জানালেন, এই বিষয় পড়তে গিয়ে তাঁকে বেশ ধকল পোহাতে হয়েছে। তবু তিনি বাংলায় পড়ার চেয়ে একটু কষ্ট করে ইংরেজিটা ভালোভাবে শিখে নেওয়ার পক্ষে। কারণ, উচ্চতর ডিগ্রি নিতে দেশের বাইরে পড়তে গেলে ইংরেজির বিকল্প নেই।
প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটা ক্লাসেই ‘ইংরেজি’ বিষয়টা থাকে। একটা ভাষা ১২ বছর ধরে শেখার পরও কেন শিক্ষার্থীদের সমস্যায় পড়তে হয়? প্রশ্ন করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্যের কাছে। তাঁর মতে, সমস্যা দুইটি। প্রথমত, ইংরেজি শেখানোর পদ্ধতি; দ্বিতীয়ত, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে দক্ষ শিক্ষকের অভাব। আরেকটি সংকটের কথা তুলে ধরেছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি বলছেন, ‘আমাদের যে ইংরেজি শেখানো হয়, সেটা আসলে অনেকটা দেশীয় ইংরেজি। এর ফলে যখন শিক্ষার্থীরা স্নাতক পর্যায়ে পড়া শুরু করছে, সেখানে গিয়ে আকাশ থেকে পড়ছে। কারণ, তার হাতে যে বইটি, সেটি আন্তর্জাতিক মানের। দেশে ভালো অনুবাদক নেই। একটি বইয়ের মান ধরে রেখে তার অনুবাদ করার জন্য যে দক্ষতা থাকা দরকার, সেটা নেই। তাই যদি ইংরেজিতেই শিক্ষার্থীদের পড়াতে হয়, সেই অনুয়ায়ী সিলেবাস ও শিক্ষক থাকা প্রয়োজন।’ তাঁর কথার প্রমাণ পাওয়া গেল মুমু বড়ুয়ার কাছে। বলছিলেন, ‘লিগ্যাল ইংলিশ কঠিন লাগছিল বলে বইটির একটা বাংলা অনুবাদ সংগ্রহ করেছিলাম। ওই অনুবাদ ইংরেজির চেয়েও কঠিন ছিল!’
বাংলায় পড়াতে পারলেই ভালো হয় বলে মনে করেন বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন। তাঁর মতে, ‘বাংলা হলো মনের ভাষা। এই ভাষায় পড়লে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমে, তারা দ্রুত শিখতে পারে। এখন শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার খাতায় যা লেখে, তা তো অনেকটা বাংলার মতোই। ভাষাগত ভুলত্রুটি বিবেচনা করলে অনেক শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় পাস করতে পারবে না।’
এই সমস্যা থেকে উতরানোর উপায় কী? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাফিউজ্জামান চঞ্চল যেমন ক্লাসগুলো কঠিন মনে হলেও নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন। গল্পের বইয়ের মতো পাঠ্যবই পড়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতো অনেক শিক্ষার্থীই এই বিপাকের ‘সুযোগ’ কাজে লাগিয়ে ইংরেজির ভয়কে জয় করেছেন। তবে বুয়েটের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্য, ‘ইংরেজি ভালোভাবে শিখতে হলে বাংলাটা ভালো জানতে হবে। কারণ, আমরা তো প্রথমে বাক্যটাকে মনে মনে বাংলায় সাজাই তারপর ইংরেজি করি।’